ধামইরহাট উপজেলার দর্শনীয় স্থানগুলো


বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমা অঞ্চলে অবস্থিত রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা হচ্ছে নওগাঁ। নওগাঁ জেলা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্তে ঘেষা ধামইরহাট উপজেলা।ধামইরহাট জেলার প্রধান দর্শনের স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে।
ধামইরহাট-উপজেলা


আলতা দীঘি জাতীয় উদ্যান, ঐতিহাসিক জগদ্দল বিহার, ভীমের পান্টি (গড়ুর স্তম্ভ), আগ্রাদ্বিগুণ ধাপ (অগ্রপুরী বিহার) দিব্যক জয় স্তম্ভ যা পাল আমলে ঐতিহ্য বহন করে এছাড়াও এখানে বিভিন্ন মন্দির ও প্রত্নতান্ত্রিক নির্দশনও রয়েছে যা পর্যটকের আকর্ষণ করে।

পেজ সূচিপত্র:ধামইরহাট উপজেলায় দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা গুলো হচ্ছে

আলতা দীঘি জাতীয় উদ্যান

বাংলাদেশ ভারত সীমান্তবর্তী অংশে অবস্থিত এটি প্রাচীন জলাশয়। দীঘিটির আয়তন ৪৩ একর। এই জলাশয় এর প্রস্থ ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ১১০০ মিটার। পাহাড়ের মত পাড়গুলি উচু এবং দক্ষিণ পাড় শালবনে ঢাকা। প্রাচীন দীঘি গুলির মধ্যে এটি বোধয় বাংলাদেশের সর্ব বৃহত্তম সচল দীঘি। উল্লেখ্য বিশাল দিঘী রামসাগরের দৈর্ঘ্যের এটির চেয়ে দেড়শ মিটার বেশি হলেও চওড়ায় দেড়শ মিটার কম। আর রামসাগর ১৭৫০ সালে দিকে খনন করা হয় কিন্তু আলতা দীঘি হিন্দু বৌদ্ধ যুগের দিঘী স্থায়ী ও মানুষ মুখে একটা গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে যে সাধারণ প্রজার পানি সংকটের নিরসন করার জন্য রাজা বিশ্ব নাথ রাজমাতা সন্তষ্টির জন্য দীঘিটি খনন করে।
আলতা-দীঘি-জাতীয়-উদ্যান

রাজ মাতার শর্ত পূরণের বিষয়টি মন্ত্রীদের সঙ্গে রাজা পরামর্শ করে আলতা নিয়ে আসেন । অতঃপর একদিন ঘটা করে মন্ত্রী বরের সবাই রাজ মাতা কে অনুসরণ করে এবং রাজ মাতা হাঁটতে শুরু করেন কিন্তু রাজ মাতা হাটা আর শেষ হয় না তিনি হাঁটতেই থাকেন। তারপর পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে মন্ত্রীবর দীঘির শেষ প্রান্ত রাজ মাতার পায়ে আলতা ছিটিয়ে দিয়ে তাকে থামিয়ে দেন এই বলে যে মা আপনার পা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। আপনি আর হাঁটতে পারবেন না। যে স্থানে গিয়ে রাজ মাতা হাঁটা বন্ধ করেছিলেন শুরুই স্থান থেকে সেই অবধি পর্যন্ত রাজা বিশ্বনাথ দিঘী খনন করেছিলেন। সে থেকে এই দীঘিটি আলতা দীঘি নামে পরিচিত লাভ করে।

ঐতিহাসিক জগদ্দল বিহার।

ইতিহাস
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে রাজা রামপাল গৌর রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর রামাবতী নগরের রাজধানী স্থাপন করে। প্রাচীন বাংলা ধর্মমঙ্গল কাব্যগুলিতে রামাবতী উল্লেখ আছে। রাজা রামপালের পুত্র মদন পালের তাম্র শাসনেও রামাবতীর নগরীর উল্লেখ আছে। দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন যে এই রামাবতী নগরে রাজা রাম পাল জগদল মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক রাম প্রাণ গুপ্ত জগদল বিহার দিনাজপুরে অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছেন। রাম প্রাণ গুপ্তের জগদ্দল বিহার যে নওগাঁ জেলার আলোচ্য বিহার তা সহজে বুঝা যায়। কারণ পূর্বে এই জেলার দিনাজপুর জেলার অংশ ছিল। একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজারাম পাল এই মন্দির নির্মাণ করেন বলে নীহাররঞ্জন রায় গ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর গ্রন্থটি হচ্ছে বাঙালির ইতিহাস। এই গন্ত্রে আরো উল্লেখ আছে যে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা দেবতা ছিলেন অবলোকিতেশ্বর আর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন মহাতারা।
ঐতিহাসিক-জগদ্দল -বিহার

গুরুত্ব

এই বিহারটি প্রাচীন বাংলা শিক্ষা দীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এই বিহারের দুইজন স্বনামধন্য পন্ডিত হলেন দানশীল ও বিভূতি চন্দ্র। প্রায় ষাটখানা গ্রন্থে তিব্বতী অনুবাদ করেন আচার্য দানশীল। রাজপুত্র বিভূতিচন্দ্র ছিলেন একাধারে গ্রন্থকার টীকাকার অনুবাদক ও সংশোধক। কথিত আছে যে কাশ্মীরের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত শাক্যশ্রী ভদ্র ১২০০ খ্রিস্টাব্দের বিভিন্ন বিহারের দর্শন করেন জগদল বিহারে এসেছিলেন।

বাংলার জগদ্দল বিহারে বৌদ্ধ পন্ডিত বিদ্যাকর সুভাষিত রত্নকোষ নামে একটি কোষ কাব্য সংকলন সমাপ্ত করেছিলেন। প্রাচীন বাংলার এই জ্ঞান সাধন কেন্দ্র আজ সম্পূর্ণ ধ্বংস প্রাপ্ত। বাংলাদেশে প্রন্ততত্ত্ব বিভাগ তত্ত্বাবধানে বর্তমানে এ স্থানটিতে খনন কাজ চলতেছে।

ভীমের পান্টি (গড়ুর স্তম্ভ) ইতিহাস নিয়েছে উল্লেখ করা হলো

ইতিহাস
১৭০০ শতকের কোন এক সময় জাহানপুর ইউনিয়নের আশেপাশে বেশ কিছু মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। তবে সেগুলো কে বা কারা তৈরি করেছিল সে ব্যাপারে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। জনশ্রুতি অনুসারে বীরেশ্বর ব্রক্ষচারী নামক একজন সাধক এখানে এসে বসবাস শুরু করেন ও তিনি বেশ কয়েকটি ঢিবি পরিষ্কার করে। অনেক স্থাপনায় বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না তবে ১৯৭৮ সালের দিকে এটি স্থানে কালো পাথরের তৈরি একটি মূর্তি পাওয়া যায়। বীরেশ্বর ব্রহ্মচারী কোন একটি ঢিবির উপর ছোট্ট আকারে চারটি মন্দির নির্মাণ করে উক্ত মূর্তিটি স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়।
ভীমের-পান্টি


ঢিবির পাশে একটি ভাঙ্গা দেওয়াল ছিল বলে ধারণা করা হয়। দেয়ালে উত্তরাংশে বর্তমানে ফসলের জমি মাঝে একটি কালো পাথরের লম্বা খন্ড হেলানো ভাবে রয়েছে এটিকে ভীমের পান্টি নামে পরিচিত হিসেবে বর্তমানে প্রচলিত আছে।

ভীমের প্যান্টি সম্পর্কে স্থানীয় জনমহলের কথা হল মহাভারতের ভীমের সাথে স্তম্ভটির সম্পর্ক আছে। ভীম রাতভর জমিতে হাল চাষ করতেন। সকাল হওয়ার আগে তার ফিরে যাওয়ার নিয়ম ছিল। কোন এক রাতে হাল চাষ দেরী হয়ে যাওয়ায় তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় ভীমের হাতের পান্টিটি ফেলে যান। সেটিই বর্তমানে স্তম্ভ। ভীমের পান্টি কৈবর্ত রাজা ভীম দ্বারা দ্বাদশ শতাধিতে নির্মিত বলে ঐতিহাসিকদের মত।

অবকাঠামো

ভীমের পান্টির আকৃতি অনেকটা প্রলম্বিত মোচার ন্যায়। মসৃণ এ খন্ডিত ৩.৭৯ মিটার উঁচু ও গোড়ার দিকে এর ব্যাস ওয়ান পয়েন্ট ৮০ মিটার। পূর্বে এইখণ্ডের মাথার উপরে একটি পাখির মূর্তি বসানো ছিল। স্তম্ভটি উপরে বজ্রপাত পড়ার ফলে পাখি মূর্তিটি ভেঙ্গে পড়ে যায় আর স্তম্ভটি একদিকে হেলে যায়। ভীমের পান্টির উপরের দিকে সংস্কৃতি ভাষায় ২৮ লাইন একটি লিপি খোদাই করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্ববিদ গণদের মতে পাল সাম্রাজ্যের নারায়ন পালের মন্ত্রী ভটুগুরুভ (৮৯৬-৯৫০) এই পাথর খন্ডটি স্থাপন করেন।

আগ্রাদিগুণ ধাপ বা অগ্ৰপুরী বিহার।


ইতিহাস
ধামইরহাট ও পত্নীতলা উপজেলা কালের সাক্ষী হিসাবে প্রমাণিত রয়েছে বেশ ক টি প্রত্নঢিবি। এগুলোর মধ্যে আগ্রাদিগুণ ধাপ মাহিসন্তোষ দুর্গ রঘুনাথপুরের ধাপ ও যোগীঘোপার ধাপের টিকর উল্লেখযোগ্য। ঢিবি গুলো এখনো খনন করা হয়নি। এইসব ঢিবির মধ্যে আগ্রাদিগুণ ধাপ আকৃতি ও উচ্চতায় অনেক বড় ও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেয়। রাজা দ্বারকানাথ এতে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ওঠে। তারপর রহস্যজনক ভাবে রাজদরবারের প্রধান প্রধান দরজা গুলো বন্ধ হয়ে যায়। অনুসন্ধান করে জানা যায় রাজা সপরিবারে পশ্চিম দিকের সুরঙ্গ পথ দিয়ে পালিয়েছে। আগন্তুক দরবেশ সেজে শেষ পর্যন্ত অবিবাহিত জীবন কাটায় এবং এখানে ইন্তেকাল করেন। ঢিবির সংলগ্ন পাকা রাস্তার পূর্ব পাশে রয়েছে অতি পূরণে একটি মাজা। মাজারের পাশে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এই মাজারটি সেই মুসলিম দরবেশের বলে স্থানীয়রা অনুমান করেন। জনপ্রবাদটি কতটুকু সত্য তা বলা দুষ্কর।

আবার ঢিবিটির মধ্যে প্রাচীন রাজবাড়ীর ধ্বংস্তূপ থাকা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এই ঢিবিটি থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি উদ্ধার ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে ওমা মহেশ্বর প্রতিমা, বৌদ্ধদেবী তার প্রতিমা ও একটি নারী মুক্ত উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম এবং অপর দুইটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালায় সুরক্ষিত আছে। এগুলো সবই ধূসর কৃষ্ণ বেলে পাথর দ্বারা নির্মিত। বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক নিরঞ্জন রায় প্রথম দুইটি প্রতিমা কে একাদশ শতক ও শেষোক্ত নারীমুছুটি দশম শতকের তৈরি বলে মন্তব্য করেছেন।

দিব্যক জয় স্তম্ভ

নওগাঁ জেলার সাপাহার থানা দিবর দিঘীর মধ্যস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই দিঘি স্থায়ী ও জনগণের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামে পরিচিত। দিঘীটি প্রায় ২০ একর বা ৬০ বিঘা এবং ১/২ বর্গমাইল জমির উপরে অবস্থিত। দীঘিটির মাঝখানে অবস্থিত আট কোনা বিশিষ্ট গ্রানাইট পাথরের এত বড় স্তব বাংলাদেশের বিরল। এই স্তম্ভে সর্বমোট উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। পানির নিচের অংশ ছয় ফুট তিন ইঞ্চি এবং পানির উপরের অংশ ২৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। এই স্তম্ভে কোন লিপি নেই। স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা অলস্করণ দ্বারা সুশোভিত।

ইতিহাস

পাথরটির ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে।দ্বিতীয় মহিপাল ছিল দুর্বল চরিত্রহীন শাসক। দ্বিতীয় মহিপালের অযোগ্যতার কারণে বাংলার অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। কিছু সেনাপতি ও বিপথগামী লোক এই সুযোগের দ্বিতীয় মহিপাল কে হত্যা করে। দিব্যক সর্বসম্মতিক্রমে বরেন্দ্র ভূমির অধিপতি নির্বাচিত হন। দিব্যকের শাসন আমল ছিল ১০৭৫ থেকে ১১০০ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় মহিপালের সময় তিনজন রাজা বাংলা শাসন করেন। এরা হলেন দিব্যক রুদ্রক ও ভীম। ব্রিটিশ ভারতীয় বিশিষ্ট ইতিহাস লেখক বুকারন হ্যামিল্টন কে পূর্ব ভারতীয় অঞ্চল ঐতিহাসিক স্থান গুলোর উপর জরিপ করে এটি তালিকা প্রণয়নের জন্য এই অঞ্চলে পাঠান। তিনি ১৭৭৯ সালে দীঘির পাশে এসে উপস্থিত হন এবং জরিপ করে। বুকারন হ্যামিল্টনের দিঘী টিকে কৈবর্ত্যদের বলে উল্লেখ করেন।

তবে বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিং হামের মতো একাদশ শতাব্দী দিব্যকের ভ্রাতা রুদ্রকে পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কীর্তি এটি। স্তম্ভের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মাঝে মত বিরোধ থাকলেও আজ অবধি দিব্যকের কৃতিত্ব বলে আত্রা অঞ্চলে প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। ধারণা করা হয় এই শাসনামলে পাল বংশে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দিঘির মাঝখানে জয় স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। এটি একটি অখণ্ড পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘীতেও দিব্যকের অভিযান হয়েছিল এবং সেই স্থানে একটি বিজয় স্তম্ভ প্রোথিত হয়। রামপাল কর্তৃক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরে এটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

শেষ কথা: কীভাবে যাবেন


নওগাঁ জেলা সদর থেকে ধামইরহাট উপজেলা বাস বা সিএনজিযোগে সহজে যাওয়া যায়। উপজেলার প্রধান সড়ক গুলো পাকা এবং অন্যান্য স্থানগুলোতে যেতে স্থানীয় পরিবহন যেমন মাইক্রো,ভ্যান,ইজি বাইক, ব্যবহার করা যায়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এম আর ইনফো বিডি নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url